মঙ্গলবার, ১৯শে কার্তিক ১৪৩৩ - ৩ রা নভেম্বর ২০২৬ রাত
প্রচ্ছদআইন আদালতমৌলভীবাজারে সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার মামলা, জেলা...

মৌলভীবাজারে সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার মামলা, জেলা জুড়ে তোলপাড় !

মৌলভীবাজার প্রতিনিধিঃ

মৌলভীবাজারে সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার মামলা, জেলা জুড়ে তোলপাড় !

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সদ্য প্রত্যাহার হওয়া সাবেক টিএইচও ডা. সিনথিয়া তাসমিন ও সরকারি হাসপাতালের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক ‘খোলা কাগজ’-এর মৌলভীবাজার জেলা স্টাফ রিপোর্টার ও শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের যুগ্ম সদস্য সচিব এহসান বিন মুজাহির ও দৈনিক জনবাণীর জেলা প্রতিনিধি মনজু বিজয় চৌধুরী এর বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়েরের অভিযোগ উঠেছে। 

শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সদ্য বদলিকৃত সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. সিনথিয়া তাসমিন বাদী হয়ে গত ২৫ অক্টোবর সিলেট সাইবার সিকিউরিটি আদালতে
মামলা নাম্বার ২১২/২০২৬
দায়ের করেন।
ওই মামলাটিকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ‘মিথ্যা’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক সহ স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো। তারা অবিলম্বে এই হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিক মো. এহসানুল হক জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করে আসছেন। হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য প্রতিবেদন গুলো হলো—‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেয়াদহীন পাউরুটি ও নিম্নমানের কলা সরবরাহ’, ‘সরকারি হাসপাতালে রাতেও ওড়ে জাতীয় পতাকা’, ‘শ্রীমঙ্গল সরকারি হাসপাতালে নানা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ, সচেতনমহলে ক্ষোভ’, ‘জেনারেটর-আইপিএস অচল, মোমবাতিই ভরসা শ্রীমঙ্গল সরকারি হাসপাতালে’, ‘তদন্ত দাবির মধ্যেই অভিযুক্ত ডা. সিনথিয়াকে বদলি’ এবং ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমএসআর সামগ্রী সরবরাহ নিয়ে বিতর্ক’।

তিনি জানান, হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বচ্ছতা যাচাইয়ের জন্য ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’-এর আওতায় টিএইচওর দায়িত্ব পালন সম্পর্কিত ১১টি বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য চেয়ে আবেদন করেছিলেন। আবেদনকৃত তথ্যের মধ্যে ছিল—বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ, প্যাথলজি ও ভর্তি রোগীদের থেকে আদায়কৃত ফির সরকারি চালানের অনুলিপি, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও দরপত্র, জ্বালানি খরচ, সেবাগ্রহীতা রোগীর হিসাব, বাড়িভাড়া জমা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা এবং অতীতে আইপিএস ও ব্যাটারি চুরির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন।

সাংবাদিক এহসানের দাবি, এসব অনিয়মের তথ্য চেয়ে আবেদন করা ও ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের কারণেই ওই কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বানোয়াট অভিযোগ এনে এই সাইবার মামলাটি করেছেন।

মামলা প্রসঙ্গে মো. এহসানুল হক বলেন,”চাঁদা দাবি বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ হাস্যকর ও অবাস্তব। এর বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই। হামলা, মামলা বা ভয়-ভীতি দেখিয়ে আমার বস্তুনিষ্ঠ কলম থামানো যাবে না। সিআইডি, পিবিআই এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার প্রতি বিনীত অনুরোধ—আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যেন বিষয়টি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে।”

এদিকে আদালত সূত্র ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, মানহানি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগে দায়েরকৃত এ সাইবার মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে দৈনিক জনবাণীর মৌলভীবাজার প্রতিনিধি মঞ্জু বিজয় চৌধুরীকে। এছাড়া অন্যান্য আসামিরা হলেন—বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস নেতা মোজাহিদুল ইসলাম (২য় আসামি), মো. এহসানুল হক (৩য় আসামি), ‘জেন জেড শ্রীমঙ্গল’ (৪র্থ আসামি) এবং প্রবাসী আমির আলী (৫ম আসামি)।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে বিভিন্ন বেনামি ও মিথ্যা আইডি ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কুৎসা রটিয়েছেন এবং পোস্ট ডিলিট করার নামে অর্থ দাবি করেছেন। সাইবার সুরক্ষা আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলাটি দায়ের করে পুলিশ বা সিআইডিকে তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে ওই মামলার প্রধান আসামি মঞ্জু বিজয় চৌধুরী বলেন,হাসপাতালের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের কারণেই আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। মূলত ওই কর্মকর্তা নিজের প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতি ঢাকতেই এই মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেছেন। আমরা তার পূর্ববর্তী ও শ্রীমঙ্গলের কর্মস্থলের অনিযম-দুর্নীতি, প্রশাসনিক সেচ্ছচারিতা, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, চাকরিবিধি লঙ্ঘন এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঠিক তদন্তপূর্বক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।”

এ দিকে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়টি নিয়ে মৌলভীবাজারের স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। মামলার বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পর থেকে ক্ষোভে ফুঁসছেন তারা। অনেকেই স্ট্যাটাস দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নিন্দা জানাচ্ছেন। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে নিরপরাধ সাংবাদিকদের হয়রানি বন্ধের জোর দাবিও জানিয়েছেন।

জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি জাফর ইকবাল বলেন, সরকারি কর্সকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ হলেই সাংবাদিকেের বিরুদ্ধে হয় চাঁদাবাজির মামলা, না হয় সাইবার আইনে মামলা। এটা এখন সংস্কৃতি হয়ে গেছে। তাহলে সাংবাদিকরা কী করবে? হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? 

রিলেটেড

জনপ্রিয়